Poem

পরনে সফেদ শাড়ি, মুখে চন্দ্রাভা

শামসুর রাহমান

সাত বছর ধরে মা আমার দুনিয়াদারির
ঝুটঝামেলায় অনুপস্থিত। মাথা খুঁড়ে
মরলেও তাঁকে আর একটিবারও
দেখতে পাবো না। বড়ই অনুপস্থিত তিনি।

মাঝে মাঝে তার কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়াই।
ইচ্ছে থাকলেও কখনো কখনো
বড় বেশি দেরি হয়ে যায় জিয়ারত করার
দিন। ধিক্কার দিই নিজেকে গাফেলতির দরুন।

লেখার টেবিলে কলম নিয়ে বসলেই হঠাৎ
মনে পড়ে যায় মায়ের কথা। এই তো
তিনি দাঁড়িয়ে রয়েছেন আমার পাশে,মাথা বুলিয়ে
দিচ্ছেন, তাঁর দোয়ার ঝরনা ঝরছে সন্তানের মাথায়।

এই তো কোনার ঘরে জায়নামাজে
দাঁড়িয়ে, বসে তিনি নিজেকে সমর্পণ ক করতেন
খোদার দরবারে। আজো সেই দৃশ্য
সুস্পষ্ট ভেসে ওঠে দৃষ্টিপথে, বড় সাধ হয়
চুম্বন করি অপরূপ দৃশ্যটিকে। মনে হয়, অদূরে
নক্ষত্ররাজির গোলাকার অপার্থিব আলোয়
মা আমার দাঁড়িয়ে আছেন নিশ্চুপ,
নিবেদিতা, আলোকিত সত্তা। নুয়ে আসে আমার মাথা।
গোরস্তানে গেলেই কী এক নিস্তব্ধতা দখল
করে নেয় আমাকে। একদিন বিকেলে
মায়ের কবরের পাশে বসেছিলাম, হঠাৎ স্তব্ধতা
চিরে জেগে উঠলো কোকিলের ডাক। থেমে থেমে করুণ
সেই ডাক থেকে যেন ঝরছিলো কবোষ্ণ
রক্তের ফোঁটা। আহত কোকিলের সুন্দর
আর্তনাদ গোরস্তানকে অধিকতর নিঝুম
করে তুললো, সেই আর্তস্বরে আমি
আমার মাতৃবিচ্ছেদের বেদনা
কিছুদিন পর যেন নতুন করে অনুভব করলাম।

গোধূলি প্রগাঢ় হ’লে পর আমার পাশে কারো
উপস্থিতি অনুভব করলাম। যেন কেউ আমার
কাঁধে তার কোমল হাত স্থাপন
করলো, বড় চেনা মনে হলো সেই নির্জন
স্পর্শ; ঘুরে তাকাতেই দেখি মা আমার দাঁড়িয়ে
আছেন, পরনে তার সফেদ শাড়ি, মুখে চন্দ্রাভা। কে জানে
এই উপস্থিতি সত্যি নাকি আমার
প্রবল ইচ্ছা-প্রসূত দৃশ্যেরই অপরূপ বিভ্রম?

Author Bio

শামসুর রাহমান (২৩ অক্টোবর ১৯২৯ - ১৭ আগস্ট ২০০৬) বাংলাদেশ ও আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি। জীবদ্দশাতেই তিনি বাংলাদেশের প্রধান কবি হিসেবে মর্যাদালাভ করেছিলেন। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগ, তথা

More

This post views is 188

Post Topics

Total Posts

2547 Published Posts